Susunia Pahar-এর ঝর্ণা এবং পাহাড় সংলগ্ন ঘন বন-জঙ্গল যেমন তৃণভোজী প্রাণীদের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল, তেমনি তৃণভোজী প্রাণীদের টানে টানে মাংসাশী পশুদেরও বিচরণ ক্ষেত্রেও গড়ে উঠেছিল। আর এইজন্যই প্রাচীন প্রস্তরযুগ এবং পরবর্তী মধ্য, শেষ ও নব্য প্রস্তরযুগের মানুষ Susunia Hills কে নিজেদের বসবাসের উপযুক্ত স্থান বলে নির্বাচন করেছিল। তাছাড়া এই পাহাড়ের গাত্রদেশে প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উদ্ভিদ জন্মায় যেগুলি মানব দেহে নানা রোগ নিরাময়ের কাজে ব্যবহৃত হয়।
সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত-র প্রতিপক্ষ পুষ্করণাধিপতের্ম্মহারাজ চন্দ্রবর্মা শুশুনিয়া পাহাড়ের গুহাকে চক্রস্বামী বা বিষ্ণুর মন্দির হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। দুর্গ গড়ে তোলাও অসম্ভব কিছু নয়। কারণ পাহাড়ের শীর্ষ দেশে অতি দুর্গম স্থানে এই গুহার অবস্থান। নিরাপত্তার বিষয়ে এক কথায় অতি উত্তম স্থান বলা যায়। পাহাড়ের প্রায় চূড়ায় রয়েছে বাংলার প্রাচীনতম শিলালিপি যা চতুর্থ শতকে খোদিত হয়েছে। উৎকীর্ণ করেছিলেন রাজা চন্দ্রবর্মণ। নিকটেই তাঁর রাজধানী ছিল পুষ্করণা। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে রাজা চন্দ্রবর্মণ-এর সাম্রাজ্য ছিল ঢাকা ও ফরিদপুর পর্যন্ত। শুশুনিয়া থেকে উত্তর-পূর্বে পোখরনা-র (বাঁকুড়া জেলা) দূরত্ব মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার। পুষ্করণা বা পাখান্না বর্তমানে বাঁকুড়া জেলার গ্রাম। পোখরনা নামে পরিচিত এই গ্রামকেই মনে করা হয় প্রাচীন পুষ্করণ রাজ্য। যেখানে চন্দ্রবর্মণ রাজত্ব করতেন। দামোদর নদের দক্ষিণ তীরবর্তী এই পোখরনা বা প্রাচীন পুষ্করণ এবং এই চন্দ্রবর্মণকেই সমুদ্রগুপ্ত তাঁর এলাহাবাদ প্রশস্তিতে উল্লেখ করেছেন চন্দ্রবর্মা হিসেবে। চন্দ্রবর্মণ এবং চন্দ্রবর্মা আসলে এক ও অভিন্ন ব্যক্তি। চন্দ্রবর্মণকে পরাজিত করে বাঁকুড়াকে তথা বাঙ্গালা দেশকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত। সমুদ্রগুপ্ত যখন বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তখন বঙ্গ প্রদেশ কয়েকটি স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাঁদের সকলকে পরাজিত করে তিনি আর্যাবর্তে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে এই সমস্ত রাজাদের নাম তিনি উল্লেখ করে গিয়েছেন। যাদের নাম তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁদের মধ্যে দুটি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নামদুটি হল চন্দ্রবর্মা এবং নাগদত্ত। শুশুনিয়া পাহাড়ের মাথায় খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে নির্মিত যে শিলালিপি রয়েছে, তার পাঠ এই রকম–
‘পুষ্করণাধিপতের্ম্মহারাজ-
শ্রীসিঙছ্ বর্ম্মণঃ পুত্রস্য
মহারাজ শ্রীচন্দ্রবর্মণঃ কৃতিঃ
চক্রস্বামীণঃ দোসগ্রণতিসৃষ্টঃ’। লিপির ভাষা সংস্কৃত, কিন্তু অক্ষর চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের ব্রাহ্মী লিপি বলে অনেকে মনে করেন।
শুশুনিয়া পাহাড়ের মাথায় উঠতে পারলে সেসব কথা মনে আসে। চারদিকের হাওয়ায় হাওয়ায় নিখিলধ্বনি বাজে। বুকের ভিতরে নিবিড় শ্বাসে তখন যে বাতাসের আনাগোনা চলে তা যেন ইতিহাস নয়, মহাকাব্য। এতে চন্দ্রবর্মা নেই, সিংহবর্মা নেই, চল্লিশহাজার বছর আগেকার ফসিল নেই, জীবাশ্ম নেই… এ বাতাস প্রস্তরযুগ বোঝে না, বীরস্তম্ভ জানে না… শুধু প্রকৃতির নির্জনতায় চুপচাপ বসে শুশুনিয়ার গল্প শোনায়, যাকে বলা যায় লোকায়ত।
বাঁকুড়া জেলার ছাতনার কাছে পূর্ব পশ্চিমে দৈর্ঘ্যে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং ৪৪৮ মিটার (১৪৭০ ফুট) উচ্চতা বিশিষ্ট বিখ্যাত পাহাড় শুশুনিয়া। বাঁকুড়া জেলার এটি দ্বিতীয় উচ্চতম পাহাড়।
পশ্চিমবঙ্গে প্রাপ্ত প্রস্তরযুগের প্রত্ন অঞ্চলগুলির মধ্যে Susunia hills অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বিশুদ্ধ স্ফটিক, কর্ণিকার স্ফটিক, গোলাপী রঙের আকরিক সমৃদ্ধ পাথর এখানে পাওয়া যায়। সেজন্য পুরাতাত্ত্বিক ও ফসিলক্ষেত্র হিসেবে ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে Susunia Hills বিশেষ পরিচিত। এখানে এশিয়ান সিংহ, জিরাফ, হায়েনা-সহ অন্যান্য অনেক জীবজন্তুর ফসিল পাওয়া গেছে। প্রস্তরযুগের অনেক প্রত্নসামগ্রীও পাওয়া গেছে। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রাচীন প্রস্তরযুগ এবং পরবর্তী মধ্য, শেষ ও নব্য প্রস্তরযুগের ত্রিকোণাকৃতির ও ভল্লাকার হাতিয়ার- যেমন হস্তকুঠার, ভারি ছুরি, চাঁছনি ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছে। এখানে প্রাপ্ত হস্তকুঠারগুলির দৈর্ঘ্য ১০.৪ সেমি থেকে ১৯ সেমি। এছাড়া লৈভ্যাল্লোসিয়ান কৌশলে তৈরি স্ফটিক পাথরের ‘ওভেট’ অর্থাৎ ডিম্বাকৃতি অস্ত্রও পাওয়া গিয়েছে। এগুলো ৭.৫ সেমি × ৬.৪ থেকে ৮ সেমি × ৭.৩ সেমি আকৃতির। এছাড়াও চতুষ্কোণাকৃতির হাতলসহ ভারী ছুরি এবং চাঁছনি জাতীয় অস্ত্র পাওয়া গেছে যেগুলি ইংরেজি ‘ইউ’ আকৃতির। Susunia এবং তার আশেপাশে ধানকোরা, বাঁকাজোর, বাগদিহা, জামথোল, শিউলিবোনা, সুয়াবসা, গিধুরিয়া, পারুলিয়া, রামনাথপুর, পাহাড়ঘাটা, কুশবোনা, চান্দ্রা, মেটালা, ভরতপুর প্রভৃতি প্রায় ৩০ টি প্রত্নস্থল থেকে।
How to go Susunia Pahar:-
১) কলকাতা থেকে দিন / রাত, সাধারণ /বাতানুকূল বাসে বাঁকুড়া। বাঁকুড়া শহর থেকে বাস অথবা ছোটো চারচাকার ভাড়াগাড়িতে শুশুনিয়া পাহাড়।
২) হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে বাঁকুড়া হয়ে ছোটো চারচাকার ভাড়াগাড়িতে Susunia Hills। কলকাতা থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের এই পাহাড়ে ট্রেনে করে যেতে হলে আপনাকে নামতে হবে ছাতনা স্টেশনে। সেখান থেকে Susunia প্রায় ১০ কিলোমিটারের রাস্তা। হাওড়া থেকে শিরোমণি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে ছাতনা পৌঁছতে।
৩) কলকাতা থেকে নিজের গাড়িতে জিটি রোড ধরে আরামবাগ, কোতুলপুর, জয়পুর, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া হয়ে Susunia Hills ২২৫ কিলোমিটার মত পথ। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে দুর্গাপুর, বাঁকুড়া হয়ে Susunia গেলে পঁচিশ কিলোমিটারের মতো বেশি গাড়ি চালাতে হবে।
Hotels in Susonia Hills:-
থাকার জন্য বাসস্ট্যান্ড কে কেন্দ্র করে গ্রিনলজ, কোলে রেস্টহাউস, পঞ্চায়েত রেস্টহাউস, যুব আবাস, যোগাযোগ:- 22480626. শুশুনিয়া ফরেস্ট কটেজ, শুভম রিসোর্ট, কমলাকান্ত গেস্টহাউস রয়েছে।
শুশুনিয়ার কাছে বাঁকুড়া-শালতোড়-মধুকুন্ডা পথে বা কলকাতা থেকে সরাসরি যাত্রায় হাওড়া-আদ্রা রেলপথে ইতুড়ি মোড় থেকে বাম দিকের পথে নান্দনিক প্রকৃতির মাজে বাঁকুড়ার সর্বোচ্চ পাহাড় বিবারীনাথও জয় করে নিতে পারেন ট্রেকারে। বিহারীনাথে শিবের মন্দির হয়েছে। থাকার জন্য শ্রাবনী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির অতিথি ভবন আছে। যোগাযোগ:- 9647902125.
বিহারীনাথ থেকে ১৫ কিমি আর কলকাতা থেকে ২৬৩ কিলোমিটার সরাসরি যাত্রায় আসানসোল-আদ্রা শাখার মুরাডি স্টেশন থেকে ৬ কিমি দুরে জঙ্গল-পাহাড়-লেকে মোড়া সাঁওতাল অধ্যুষিত বড়ন্তিও এক অনন্য সুন্দর ভ্রমণ গন্তব্য। বড়ন্তি থেকে গড়পঞ্চকোট ১২ কিলোমিটার, জয়চন্ডিপাহাড় ২১ কিলোমিটার, পাঞ্চেত জলাধার ২২ কিলোমিটার, মাইথন ও কল্যানেশ্বরী মন্দির ৩৮ কিলোমিটার, শুশুনিয়া ৩০ কিলোমিটার। বড়ন্তিতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায় "ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার স্টাডি হাট, টোটাল ঘরের সংখ্যা ১০ টি, ফোন:- 9874887046 or 9433077051
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন